ঈদের দিনের খাবার ও স্বাস্থ্য সচেতনতা

একদিন পরই পবিত্র ঈদুল ফিতর। দীর্ঘ একমাস রোজার মাধ্যমে সংযম করেছি। যেহেতু অনেকদিন খাবারের সময় ও ধরনের একই নিয়মকানুন মেনে চলার পর ঈদের পর থেকেই খাদ্যাভ্যাসে অনেক পরিবর্তন হয়ে যাবে। তাই সুস্থভাবে ঈদ উদযাপনে খাবারের মেন্যু হওয়া চায় স্বাস্থ্যকর ও সহজপাচ্য। তাছাড়া রোজার এক মাস শুধু রাতে খাওয়া হয়েছে। আর ঈদের দিন থেকেই শুরু হবে দিনের বেলায় খাওয়া-দাওয়া। এতে আপনার দৈহিক সিস্টেমে একটা পরিবর্তন আসবে।

রোজায় ইফতার, সেহরি ও রাতের খাবারের মধ্যে যেহেতু সীমাবদ্ধ থাকতে হয় এবং সেই সাথে মুখরোচক বেশকিছু খাবারও খাওয়া হয়, তাই ঈদের মেন্যুতে ভিন্নতা এনে স্বাস্থ্যকর খাবার নির্বাচন করলে ভালো। আসুন জেনে নিই ঈদের দিন খাবার দাবারের ধরন যেমন হবে।

ঈদের দিনের সকালের খাবার: ঈদের দিন সকালে সাধারণত হালকা খাবার যেমন ফলের জুস, মিষ্টান্ন ইত্যাদি খাওয়া যেতে পারে। নামাজের পর ঈদের সকালের মেন্যুতে একটু হালকা খাবার থাকলে তা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। কারণ এক মাস রোজার পর হঠাৎ করে সকালে অনেক ভারি খাবার খেয়ে নিলে তা বদহজম, পেটে ব্যথা, এসিডিটি ইত্যাদি সমস্যা করতে পারে।

এছাড়া সকালের দিকে কার্বোহাইড্রেটের অভাব পূরণে তেল ছাড়া পরোটা বা রুটির সাথে সবজির কোনো মেন্যু খাওয়া যেতে পারে। প্রোটিনের অভাব দূর করতে রুটি ও সবজির সাথে ডিম বা মুরগির মাংসের কোনো মেন্যু রাখা যেতে পারে। আবার চাইলে ডিম বা মুরগির মাংসের বদলে দুধের তৈরি ডেজার্ট খাওয়া যেতে পারে।

ঈদের দিনে দুপুরের খাবার: ঈদের দিনে দুপুরে সাধারণত পরিবারের সবাই মিলে খাওয়া হয়ে থাকে। এছাড়া এদিন বাড়িতে অনেক অতিথিও আসে এবং তাকেও খাওয়াতে হয়। এজন্য দুপুরের খাবার মেন্যুতে কার্বোহাইড্রেটের সম্পূরক হিসেবে পোলাও বা খিচুড়ি রাখা যেতে পারে। তবে খাবারগুলোতে যেন অতিরিক্ত ঘি ব্যবহার করা না হয় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।

দুপুরের খাবার তালিকায় রাখা যেতে পারে মাছের রেসিপি, যেমন— মাছের কোরমা, ফিস কাটলেট, ফিস কোপতা, গ্রিলড ফিস, বেকড ফিশ ইত্যাদি। মাছের তৈরি এসব খাবার যেমন মুখোরোচক এবং স্বাস্থ্যসম্মতও বটে। কেউ যদি এর সাথে গরু বা খাসির মাংস যোগ করেন, সে ক্ষেত্রে খাদ্য প্রস্তুতে অবশ্যই ভারসাম্য রাখতে হবে। আর এগুলো প্রস্তুতে অবশ্যই কম তেল ব্যবহার করা উচিত। দুপুরের মেন্যুকে আরো স্বাস্থ্যসম্মত করতে যেকোনো সালাদ যোগ করতে হবে।

ঈদে রাতের খাবার যেমন হবে: ঈদের দিন অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাড়িতে এবং বাইরে ঈদ আনন্দ উদযাপনের সময় সবাইকে সারাদিন বিভিন্ন রকম খাবার খেতে হয়। এজন্য রাতের খাবারের ব্যাপারে অবশ্যই সতর্ক থাকা উচিত। কারণ এসময় অর্থাৎ রাতে অতিরিক্ত খেলে হজমে গোলযোগ হয়ে শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। এজন্য রাতে ভাতের সাথে একটু ভিন্নধর্মী মেন্যু রাখা যেতে পারে যেমন রুটি, কাবাব ইত্যাদি।

এছাড়া রাতে অল্প তেলে তৈরি মোরগ পোলাও বা তেহাররি থাকতে পারে। তবে বিরিয়ানি বা তেহারির ক্ষেত্রে আনুষঙ্গিক অন্য কোনো মেন্যু না রাখাই ভালো। এছাড়া ভিন্নধর্মী খাবারের মধ্যে যেমন চাইনিজ, থাই বা ইংলিশ খাবার-দাবার রাখা যেতে পারে। এই জাতীয় খাবারে ঘি বা বাটারের ব্যবহার কম হয়, তাই এসব খাবার স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।

ঈদের দিনের ডেজার্ট ও সালাদ যেমন হতে পারে: ঈদের দিনে বিভিন্ন খাবারের পাশাপাশি কম বেশি মিষ্টান্ন তৈরি করা হয়। তাই স্বাস্থ্যসম্মত মিষ্টান্ন তৈরির ক্ষেত্রে কিছু জিনিস মাথায় রাখতে হবে যেমন শিরা বা ভাজার পরিবর্তে দুধ দিয়ে তৈরি ডেজার্ট করা উচিত।

মিষ্টান্ন তৈরিতে চিনির পরিবর্তে গুড়ের ব্যবহার করলে ভালো। এছাড়া মিষ্টান্ন তৈরিতে সবজি, শুকনো ফলের ব্যবহার করা যেতে পারে। সুস্বাস্থ্যের জন্য ফলের তৈরি কাস্টার্ড, ফল ও দই দিয়ে তৈরি স্মুদি ইত্যাদি স্বাস্থ্যকর ডেজার্ট তৈরি করা যেতে পারে। দুধের তৈরি পায়েস, টকমিষ্টি দই, পুডিং, দুধ সেমাই এগুলোও অনেক পুষ্টিকর মিষ্টান্ন। এই ধরনের মিষ্টান্ন তৈরিতে কোনো ঘি বা মাখনের প্রয়োজন হয় না এবং এতে প্রচুর প্রোটিন ও ক্যালোরি পাওয়া যায়। এজন্য ঈদের মেন্যুতে দুধের তৈরি ডেজার্ট থাকা ভালো।

আর ঈদের দিনে সালাদ নির্বাচন করতে হবে যাতে ভিটামিন ও মিনারেলের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি খাবার হজমে সাহায্য করে। তাই সালাদে ক্রিম, মেয়নেজ ইত্যাদি ব্যবহার থেকে বিরত থাকা উচিত। সালাদে মাছ বা মাংসের ব্যবহার থেকে বিরত থাকলে ভালো হয়। সেই ক্ষেত্রে শশার সালাদ, টমেটোর সালাদ, কাঁচা পেপের সালাদ, মুলার সালাদ, সবজির সালাদ ইত্যাদি মেন্যুতে রাখলে ভালো। ড্রেসিং হিসেবে ভিনেগার, সস, দই, টকদই, লেবুর রস, ফলের রস ব্যবহার করা যেতে পারে। এ ছাড়া চিনি, লবণ, মধু, গোলমরিচ, সরিষা বাটা ও অন্যান্য হার্ব বা মশলা যুক্ত করেও সালাদটি সুস্বাদু করা যেতে পারে।

ঈদ মানেই আনন্দ আর তা আমরা সাধারণত প্রকাশ করে খাওয়া দাওয়ার মাধ্যমে। তবে এদিন মুখরোচক বিভিন্ন রেসিপি থাকলেও স্বাস্থ্য ও ক্যালোরির কথা বিবেচনা করে, খাদ্য গ্রহণের পরিমাণের ওপর বিশেষভাবে খেয়াল রাখা দরকার।

যেকোনো ভারি খাবারও পরিমাণে কম গ্রহণ করলে তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতি করে না। তাই ঈদের দিনে কিছুটা হাঁটাহাঁটি এবং বিভিন্ন প্রকার কোল্ড ড্রিংক না পান করে সবাইকে পর্যাপ্ত পানি পান করা নিশ্চিত করতে হবে।

Add Comment