টেলিকমে ‘হাত বাঁধা’ ভোক্তা অধিকারের

দেশের টেলিকম অপারেটরগুলোর বিরুদ্ধে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরে প্রতিনিয়তই যুক্ত হচ্ছে নানা অভিযোগ। এগুলো নিষ্পত্তিতে আইন থাকলেও আদালতের নির্দেশে টেলিকমগুলোর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে পারছে না সরকারি সংস্থাটি। এতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে গ্রাহকদের।

কেস স্টাডি ১

সানজিদা জামান। সম্প্রতি টেলিটকের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে তিনি জানতে পারেন, ৯৭ টাকায় ১৭৫ মিনিট কেনা যায়। ওয়েবসাইটে থাকা তথ্য অনুযায়ী তিনি সিমে ১০০ টাকা তোলেন। পরবর্তী সময়ে মিনিট কিনতে নির্দিষ্ট নম্বরে ডায়াল করেন। তবে ব্যর্থ হন মিনিট কিনতে। পরে টেলিটকের হেল্প লাইনে কল করে জানতে পারেন, ৯৭ টাকায় ১৭৫ মিনিট কেনার অফারটি তার লোড দেওয়ার দুদিন আগে বন্ধ হয়ে গেছে।

সানজিদার দাবি, এই অফার বন্ধ হওয়ার পরও টেলিটক কর্তৃপক্ষ তাদের ওয়েবসাইট থেকে তা সরায়নি। এ ছাড়া সেখানে থাকা শর্তাবলীর কোথাও লেখা ছিল না, টেলিটক কর্তৃপক্ষ এই অফার যেকোনো সময় বন্ধের ক্ষমতা রাখে।

সানজিদা জানান, সেবা বিক্রয়ের জন্য অসত্য বিজ্ঞাপন দিয়েছে টেলিটক। এ ছাড়া প্রদত্ত মূল্যের বিনিময়ে প্রতিশ্রুত পণ্য বা সেবা যথাযথভাবে বিক্তয় করেনি। এ নিয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরে অভিযোগও জানিয়েছেন তিনি। কিন্তু মেলেনি ফল।

কেস স্টাডি ২

সম্প্রতি চার্জ লিস্ট নামের একটি নম্বর থেকে এসএমএস পান বাংলালিংক ব্যবহারকারী মোক্তাদির হোসেন। মেসেজে তাকে জানানো হয়, তিনি ছয়টি ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস (ভাস) গ্রহণ করেছেন। এতে তার কাছ থেকে ছয়টি সেবার প্রত্যেকটির জন্য ১৯ টাকা ৫২ পয়সা কেটে নেওয়া হয়। অর্থাৎ তার মোবাইল থেকে ১১৭.১২ টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে।

তার দাবি, তিনি এই ধরনের সার্ভিস সম্পর্কে কখনো শোনেননি। পরবর্তী সময়ে তিনি সার্ভিসগুলো বন্ধের জন্য নির্দিষ্ট নম্বরে এসএমএস পাঠান। এর মধ্যে চারটি সার্ভিস বন্ধ করতে সক্ষম হন এবং একটি সার্ভিস বন্ধ করতে ব্যর্থ হন।

মোক্তাদির আরও জানান, একটি সার্ভিস বন্ধের এসএমএস পাঠালেও সেটি সফল হয়নি। এ ছাড়া অপর একটি সার্ভিস বন্ধের জন্য এসএমএস পাঠালে ফিরতি এসএমএসে তাকে জানানো হয়, তিনি ওই সেবা নেননি। বিষয়টি বিস্তারিত জানিয়ে ভোক্তা অধিকারে মামলা করেন তিনি। তবে এখনো হয়নি সুরাহা।

আইন কী বলছে

২০০৯ সালের ৬ এপ্রিল গেজেট আকারে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন প্রকাশ হয়। আইনের সেবার সংজ্ঞাতে টেলিযোগাযোগ রয়েছে। অর্থাৎ টেলিযোগাযোগ সেবা সংক্রান্ত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পদক্ষেপ নিতে পারবে ভোক্তা অধিকার অধিদফতর। এর ফলে উল্লিখিত দুই ঘটনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে সক্ষম জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর।

আইনের ২০ এর ‘ঘ’ ধারা অনুযায়ী কোনো পণ্য বা সেবা বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে অসত্য বা মিথ্যা বিজ্ঞাপন দিয়ে ক্রেতাকে প্রতারিত করলে ব্যবস্থা নিতে পারবে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর।

‘ঙ’ ধারা অনুযায়ী প্রদত্ত মূল্যের বিনিময়ে প্রতিশ্রুত পণ্য বা সেবা যথাযথভাবে বিক্রয় বা সরবরাহ না করলে ব্যবস্থা নিতে পারবে অধিদফতর।

আইনের ২১ এর (ঠ) তে বলা হয়, কোনো পণ্য বা সেবা বিক্রয়ের জন্য অসত্য বিজ্ঞাপন দিয়ে ভোক্তাকে প্রতারিত করা হচ্ছে কি না, তার তদারকি করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে অধিদফতর।

চতুর্থ অধ্যায়ে ৪৫ ধারায় বলা হয়, কোনো ব্যক্তি প্রদত্ত মূল্যের বিনিময়ে প্রতিশ্রুত পণ্য বা সেবা যথাযথভাবে বিক্রয় বা সরবরাহ না করলে তিনি অনূর্ধ্ব এক বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

৫৩ ধারায় বলা হয়, কোনো সেবা প্রদানকারীর অবহেলা, দায়িত্বহীনতা বা অসতর্কতার কারণে সেবাগ্রহীতার অর্থ, স্বাস্থ্য বা জীবনহানি হলে তিনি অনূর্ধ্ব তিন বছর কারাদণ্ড বা অনধিক দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

যে কারণে নেওয়া যাচ্ছে না পদক্ষেপ

সানজিদা, মোক্তাদিরই শুধু নন; ভোক্তা অধিকার সূত্র বলছে, চলতি অর্থবছরে (২১ অক্টোবর পর্যন্ত) এমন ভুক্তভোগীর সংখ্যা ১৮৫ জন। গত অর্থবছরে ছিল এক হাজার ৪৪৬ জন।

আইন থাকার পরও এত ভুক্তভোগীর অভিযোগ নিষ্পত্তি করতে পারছে না ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ঝুলে রয়েছে টেলিকম অপারেটরগুলোর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তির বিষয়টি। এর আগে গত বছরের মে মাসে মোবাইল অপারেটর রবির রিটের পরিপ্রেক্ষিতে (রিট পিটিশন নং- ৬৮৯৫/২০১৭) হাইকোর্ট বিভাগ রবিসহ সব টেলিকম কোম্পানি সম্পর্কিত ভোক্তাদের অভিযোগ নিষ্পত্তিতে প্রয়োগকৃত জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ এর ৭০ ধারা আট সপ্তাহের জন্য স্থগিত করেন, যা এখনো ঝুলে রয়েছে।

বিষয়টি প্রিয়.কমকে নিশ্চিত করেন ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের প্রশাসন ও অর্থ বিভাগের পরিচালক মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘একটি কমপ্লেইন (অভিযোগ) অ্যাড্রেস (জানা) করার পরে বিবাদী পক্ষ হাইকোর্টে গিয়ে রিট করেছিল এবং হাইকোর্টের একটি রুলের কারণে এখন আমরা (ব্যবস্থা নিতে) পারছি না।’

এ বিষয়ে অধিদফতরের তদন্ত শাখার সহকারী পরিচালক মো. মাসুম আরেফিন বলেন, ‘আমরা হাইকোর্টের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। এই রায় অধিদফতরের পক্ষে আসলে আমরা পুনরায় অভিযোগগুলো দেখভাল করব এবং এতে গ্রাহক ফের প্রতিকার পাবে।’

বিটিআরসি কী করছে

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে টেলিকম অপারেটরগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়েছে এক হাজার ৪৯৬টি।

এসবের মধ্যে ছিল নেটওয়ার্ক, সিম বন্ধ, ট্যারিফ, ভাস, রিচার্জ, ডাটা স্পিডসহ বিভিন্ন সেবা সংক্রান্ত অভিযোগ। অর্থাৎ এসব সেবা টেলিকম অপারেটরগুলোর কাছ থেকে অর্থের বিনিময়ে নিলেও সঠিকভাবে পাচ্ছেন না গ্রাহকরা।

বিটিআরসি জানিয়েছে, মোট এক হাজার ৪৯৬টি অভিযোগের মধ্যে তারা এক হাজার ৩৬৬টি নিষ্পত্তি করতে পেরেছে। এ ছাড়া গ্রাহকদের করা ১৩০টি অভিযোগ সমাধানের পথে। প্রতি মাসেই গড়ে সাড়ে ৪০০টির বেশি অভিযোগ জমা হচ্ছে বিটিআরসির হেল্প লাইন ‘১০০’তে কল করে।

বিটিআরসির এক কর্মকর্তা জানান, গ্রাহকদের কাছ থেকে আসা অভিযোগ আমলে নিয়ে অপারেটরদের জানান তারা। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অপারেটরগুলো কী পদক্ষেপ নেয়, এটিও তদারক করা হয়। একই সঙ্গে একই সমস্যার পুনরাবৃত্তির বিষয়েও যথাযথ ব্যবস্থা নেয় বিটিআরসি।

Add Comment